ঢাকা সোমবার, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২০২৬

যেসব কারণে বিএনপির ভূমিধস বিজয়

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬, ১০:১৬ রাত

ছবি: সংগৃহীত

দীর্ঘ ১৭ বছর পর ১২ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে সারাদেশে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। প্রচার-প্রচারণা, রাজনৈতিক বাকযুদ্ধ ও উত্তেজনার মধ্যেও বড় ধরনের সহিংসতা ছাড়াই সম্পন্ন হয় ভোটগ্রহণ। ফলাফল বলছে, ২৯৯টি আসনের মধ্যে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসনে জয় পেয়ে এককভাবে সরকার গঠনের অবস্থানে চলে গেছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটি পেয়েছে ২০৯টি আসন, যা দেশের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁকবদল হিসেবে দেখছেন বিশ্লেষকেরা।

রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, এই ভূমিধস জয়ের পেছনে বহুমাত্রিক কারণ কাজ করেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচিত হচ্ছে দলের চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর কৌশলী ও সময়োপযোগী নেতৃত্ব। দীর্ঘ সময় প্রবাসে থাকার পর সক্রিয়ভাবে রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন, দলীয় কোন্দল নিরসনে কঠোর অবস্থান, বিদ্রোহী প্রার্থীদের সমঝোতায় আনা এবং তৃণমূলের মতামতকে প্রাধান্য দেওয়া—এসব পদক্ষেপ দলকে ঐক্যবদ্ধ রাখতে সহায়তা করেছে। বিশ্লেষকদের ভাষ্য, প্রতিহিংসার বদলে সহনশীলতার বার্তা এবং প্রতিপক্ষের প্রতি পরিমিত বক্তব্য তরুণ ভোটার ও সুশীল সমাজে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে।

দলের দীর্ঘ আন্দোলন-সংগ্রাম ও নেতাকর্মীদের কারাবরণ সাধারণ মানুষের মধ্যে সহমর্মিতা তৈরি করেছে বলেও মত বিশ্লেষকদের। সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া-র মৃত্যুকে ঘিরে সৃষ্ট আবেগও ভোটের বাক্সে প্রভাব ফেলেছে বলে তারা মনে করছেন।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে ৫ আগস্টের পর বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ-এর কার্যক্রম নিষিদ্ধ হওয়া এবং মাঠে অনুপস্থিতি বিএনপিকে প্রধান বিকল্প শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অনেক ভোটার ‘স্থিতিশীল’ ও ‘জাতীয়তাবাদী’ শক্তি হিসেবে বিএনপিকেই বেছে নিয়েছেন। তরুণ প্রজন্মের একটি বড় অংশ দলের সংস্কারমুখী ইশতেহার, কর্মসংস্থান প্রতিশ্রুতি ও সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির প্রতি আকৃষ্ট হয়েছে।

এবারের নির্বাচনে সংখ্যালঘু ভোটের একটি অংশের মেরুকরণও আলোচনায় এসেছে। ঐতিহাসিকভাবে আওয়ামী লীগের প্রতি ঝোঁক থাকলেও এবার তাদের একটি অংশ কৌশলগত কারণে বিএনপিকে সমর্থন দিয়েছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা। ডানপন্থি শক্তির উত্থান ঠেকাতে কিংবা স্থিতিশীলতার স্বার্থে অনেকেই ধানের শীষ প্রতীকে ভোট দিয়েছেন—এমন মূল্যায়নও রয়েছে।

বিপুল জয়ের পর দলীয় নেতৃত্বে সতর্কতার সুর শোনা গেছে। বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর ফলাফলকে ‘আনন্দময় ও বিষাদময়’ বলে উল্লেখ করে বলেন, এই বিজয় দলের জন্য গর্বের হলেও খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতি বড় শূন্যতা। একই সঙ্গে তিনি গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ ও স্বচ্ছতা বজায় রাখার ওপর জোর দেন।

দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, জনগণের এই সমর্থন একটি বড় দায়িত্ব। তার ভাষ্য, অর্থনীতি, ব্যাংকিং খাত ও প্রশাসনে সুশাসন ফিরিয়ে আনা হবে নতুন সরকারের প্রধান চ্যালেঞ্জ।

তবে বিজয়ের আনন্দের পাশাপাশি সামনে রয়েছে কঠিন বাস্তবতা। অর্থনীতির তারল্য সংকট, ব্যাংকিং খাতের দুরবস্থা, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে চাপ এবং বিনিয়োগ স্থবিরতা—সব মিলিয়ে নতুন সরকারের জন্য পরিস্থিতি সহজ নয়। গত কয়েক বছরের অস্থিরতায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতি এবং প্রশাসনিক কাঠামোয় স্থবিরতাও বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বিপুল জনসমর্থন ধরে রাখতে হলে বিএনপিকে দ্রুত কার্যকর সংস্কার উদ্যোগ নিতে হবে। নতুবা প্রত্যাশা ও বাস্তবতার ব্যবধান রাজনৈতিক চাপ তৈরি করতে পারে।

Link copied!