গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় নিশ্চিত হওয়ার পর জাতীয় সংসদে উচ্চকক্ষ সংযোজনের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে। কারা হবেন এই উচ্চকক্ষের সদস্য, কী হবে তাঁদের যোগ্যতা এবং মনোনয়ন প্রক্রিয়া—এসব প্রশ্ন নিয়ে রাজনৈতিক অঙ্গনে চলছে বিস্তর আলোচনা। জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশে বিষয়টি নীতিগতভাবে উত্থাপিত হলেও সদস্য মনোনয়ন নিয়ে নির্দিষ্ট নির্দেশনা স্পষ্ট নয়। ফলে দলগুলোর মনোনয়নই হবে সদস্য নির্বাচনের মূল ভিত্তি—এমনটাই ধারণা করা হচ্ছে।
পরাজিত প্রার্থীদের সুযোগ থাকবে কি?
জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সুপারিশ অনুযায়ী, সাধারণত নিম্নকক্ষ ও উচ্চকক্ষের নির্বাচন একই সময় হওয়ার কথা। তবে বর্তমান বাস্তবতায় নিম্নকক্ষের নির্বাচন আগে সম্পন্ন হওয়ায় একটি বিশেষ বিধান অন্তর্ভুক্ত করার আলোচনা চলছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের ক্ষেত্রে নিম্নকক্ষে পরাজিত প্রার্থীরাও উচ্চকক্ষের সদস্য হওয়ার সুযোগ পেতে পারেন। তবে এটি কেবল এই সংসদের জন্য প্রযোজ্য থাকবে; ভবিষ্যতে এ সুযোগ আর থাকবে না।
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ও জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি আলী রীয়াজ এ বিষয়ে জানান, রাজনৈতিক দলগুলো চাইলে এবারের নির্বাচনে পরাজিত প্রার্থীদের উচ্চকক্ষে মনোনয়ন দিতে পারবে। কারণ, গণভোটের আগে সংবিধান সংশোধন নিশ্চিত ছিল না। এখন ‘হ্যাঁ’ ভোটে অনুমোদনের ফলে সংবিধান সংস্কারের বাধ্যবাধকতা তৈরি হয়েছে। চতুর্দশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন হবে সংশোধিত সংবিধানের অধীনে। তখন উভয় কক্ষের নির্বাচন একই সঙ্গে হবে এবং একজন ব্যক্তিকে দুই কক্ষেই মনোনয়ন দেওয়ার সুযোগ থাকবে না।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান সংবিধানে উচ্চকক্ষের কোনো বিধান নেই। এ কারণেই এবারের সংসদের জন্য একটি অন্তর্বর্তী ব্যবস্থা বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে, যাতে দলগুলো চাইলে পরাজিত প্রার্থীদের উচ্চকক্ষে মনোনীত করতে পারে।
উচ্চকক্ষের কাঠামো ও গঠনপ্রক্রিয়া
উচ্চকক্ষের চূড়ান্ত কাঠামো নির্ভর করবে সংশোধিত সংবিধান ও প্রণীত আইনের ওপর। সম্ভাব্য ব্যবস্থায় সরাসরি কিংবা পরোক্ষ—উভয় ধরনের নির্বাচনী পদ্ধতি থাকতে পারে। বিশেষজ্ঞ, নারী বা সংখ্যালঘু প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করতে মনোনয়নভিত্তিক ব্যবস্থাও অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। সদস্যরা নির্দিষ্ট মেয়াদের জন্য দায়িত্ব পালন করবেন এবং শপথের মাধ্যমে কার্যক্রম শুরু করবেন।
‘জুলাই জাতীয় সনদ (সংবিধান সংস্কার) আদেশ, ২০২৫’ অনুযায়ী, উচ্চকক্ষ হবে ১০৫ সদস্যবিশিষ্ট। এর মধ্যে ১০০ জন নির্বাচিত হবেন সংসদ নির্বাচনে দলগুলোর প্রাপ্ত আসনের আনুপাতিক হারে। বাকি ৫ জনকে রাষ্ট্রপতি শিক্ষাবিদ, বিজ্ঞানী বা বিশেষজ্ঞদের মধ্য থেকে মনোনীত করবেন। সংসদ নির্বাচনের পর গঠিত সংবিধান সংস্কার পরিষদ ১৮০ কার্যদিবসের মধ্যে সংস্কার কার্যক্রম সম্পন্ন করবে এবং তার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে উচ্চকক্ষ গঠন করা হবে। উচ্চকক্ষের মেয়াদ হবে নিম্নকক্ষের শেষ কার্যদিবস পর্যন্ত।
দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদের কার্যপরিধি
উচ্চকক্ষ প্রতিষ্ঠিত হলে দেশের সংসদ কার্যত দ্বিকক্ষবিশিষ্ট রূপ পাবে। উচ্চকক্ষের প্রধান দায়িত্ব হবে আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া পর্যালোচনা ও পুনর্বিবেচনা করা। বিশেষত সাংবিধানিক ও গুরুত্বপূর্ণ আইন সংশোধনের ক্ষেত্রে এ কক্ষের বিশেষ ভূমিকা থাকবে। তবে উচ্চকক্ষ সরকারের বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনতে পারবে না; যদিও সরকারের জবাবদিহি নিশ্চিত করতে প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারবে।
এ ছাড়া আঞ্চলিক প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার মাধ্যমে জাতীয় রাজনীতিতে প্রান্তিক কণ্ঠস্বর তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি হবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। দুই কক্ষের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দিলে আলোচনার মাধ্যমে সমাধানের বিধান রাখার প্রস্তাব রয়েছে।
উল্লেখ্য, প্রস্তাবিত কাঠামো অনুযায়ী জাতীয় সংসদের মোট আসন হবে ৫০৫টি। এর মধ্যে নিম্নকক্ষে থাকবে ৪০০টি আসন। প্রচলিত সরাসরি ভোট পদ্ধতিতে ৩০০টি সাধারণ আসনে নির্বাচন হবে এবং বাকি ১০০টি আসন নারীদের জন্য সংরক্ষিত থাকবে, যেখানে নির্দিষ্ট নির্বাচনি এলাকা থেকে সরাসরি ভোটের মাধ্যমে নারী প্রার্থীরা নির্বাচিত হবেন।

আপনার মতামত লিখুন :