ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে খুলনা ও রংপুর বিভাগে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর শক্ত অবস্থান নতুন রাজনৈতিক সমীকরণের ইঙ্গিত দিয়েছে। জাতীয় পর্যায়ে সরকার গঠনের পথে এগোলেও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে প্রত্যাশিত সাফল্য পায়নি। অন্যদিকে বহু আসনে জয়ের মাধ্যমে জামায়াত এ দুই বিভাগে কার্যত নিজেদের প্রভাব বিস্তার করেছে।
খুলনায় ভূমিধস, রংপুরে হিসাব বদল
খুলনা বিভাগের ৩৬টি আসনের মধ্যে ২৫টিতে জয় পেয়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। বিএনপি পেয়েছে ১১টি আসন। যশোর, ঝিনাইদহ, সাতক্ষীরা, বাগেরহাট, কুষ্টিয়া, মেহেরপুরসহ একাধিক জেলায় জামায়াতের প্রার্থীরা এগিয়ে থাকেন। বিশেষ করে যশোরের ছয়টির মধ্যে পাঁচটি আসনে জামায়াতের জয় স্থানীয় রাজনীতিতে বড় পরিবর্তনের বার্তা দিয়েছে।
রংপুর বিভাগেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। দীর্ঘদিন ধরে জাতীয় পার্টি (জাপা)-ঘনিষ্ঠ এলাকা হিসেবে পরিচিত বৃহত্তর রংপুরে এবার দলটি প্রায় ভরাডুবির মুখে পড়ে। রংপুর-৩ আসনে জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের তৃতীয় হন। গাইবান্ধা-১ আসনেও জাপার প্রার্থী পিছিয়ে পড়েন। এসব আসনে জামায়াতের প্রার্থীরা বড় ব্যবধানে জয়ী হন।
বিশ্লেষকদের চোখে প্রধান কারণ
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল, মনোনয়ন–বিতর্ক এবং মাঠপর্যায়ে সমন্বয়হীনতা বহু আসনে প্রভাব ফেলেছে। মনোনয়ন পরিবর্তন বা বঞ্চনার অভিযোগে অনেক এলাকায় দলীয় কর্মীদের নিষ্ক্রিয়তা দেখা গেছে। এর সুযোগ নিয়েছে জামায়াত।
যশোর-১, যশোর-৫ ও যশোর-৬ আসনসহ একাধিক জায়গায় প্রার্থী বদলের পর দলীয় বিভাজন প্রকট হয়। স্থানীয় নেতাদের একাংশ মাঠে সক্রিয় না থাকায় ভোটব্যাংক ছত্রভঙ্গ হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএনপির কয়েকজন নেতাও প্রকাশ্যে পরাজয়ের কারণ অনুসন্ধানের কথা জানিয়েছেন।
অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীদের ‘ক্লিন ইমেজ’, দীর্ঘদিনের সেবামূলক কার্যক্রম এবং সংগঠনভিত্তিক শক্ত অবস্থান গ্রামীণ ভোটে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা। ধর্মীয় আবহ, নির্দিষ্ট ভোটব্যাংক এবং তরুণ ও নারী ভোটারদের অংশগ্রহণও কিছু আসনে ফল নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে।
জাপার দুর্বলতা ও ভোটের স্রোত
রংপুর অঞ্চলে জাপার ঐতিহ্যগত প্রভাব থাকলেও এবারের নির্বাচনে সেই ভিত্তি নড়বড়ে হয়ে যায়। বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ক্ষমতাসীনদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ অবস্থানের কারণে দলটির স্বকীয়তা ক্ষুণ্ন হয়েছে। কর্মী–সমর্থকের ভাঙন এবং সাংগঠনিক দুর্বলতাও ফলাফলে প্রতিফলিত হয়েছে। অনেক ভোটার বিকল্প শক্তি হিসেবে জামায়াতকে বেছে নিয়েছেন।
পাবনায় হাড্ডাহাড্ডি লড়াই
পাবনার পাঁচ আসনের মধ্যে তিনটিতে জয় পেয়েছে জামায়াত, দুটিতে বিএনপি। কয়েকটি আসনে বিএনপির হেভিওয়েট প্রার্থীর পরাজয় আলোচনার জন্ম দিয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দলীয় বিভক্তি, বিতর্কিত ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততা এবং ভোটারদের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি হওয়ায় প্রত্যাশিত ফল আসেনি। অন্যদিকে জামায়াত প্রার্থীরা সংগঠিত প্রচার ও স্থিতিশীল প্রচারণার সুবিধা পেয়েছেন।
পরিবর্তনের ইঙ্গিত
খুলনা ও রংপুরে এবারের ফলাফল দক্ষিণ-পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের রাজনীতিতে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, এই দুই বিভাগে জামায়াতের শক্ত অবস্থান ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক সমীকরণে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। একই সঙ্গে বড় দলগুলোর জন্য এটি সাংগঠনিক পুনর্বিন্যাস ও আত্মসমালোচনার বার্তাও বহন করছে।

আপনার মতামত লিখুন :