গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট জয় পেলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। কারণ, যে প্রক্রিয়ায় জুলাই সনদ বাস্তবায়নের আদেশ জারি হয়েছে, তা নিয়ে সংবিধান বিশেষজ্ঞদের মধ্যে স্পষ্ট আপত্তি রয়েছে। ফলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদে এ সনদ কার্যকর করতে সরকারি দল হিসেবে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) কতটা বাধ্য থাকবে—তা নিয়ে নতুন করে বিতর্ক শুরু হয়েছে।
বিএনপি ইতোমধ্যে জুলাই সনদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ বা ভিন্নমত জানিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে—সংসদের নিম্নকক্ষে প্রাপ্ত ভোটের হার অনুযায়ী উচ্চকক্ষ গঠনের প্রস্তাব, দলীয় প্রধান ও সরকারপ্রধান একই ব্যক্তি না হওয়ার বিধান, এবং পাবলিক সার্ভিস কমিশন ও দুর্নীতি দমন কমিশনসহ সাংবিধানিক ও বিধিবদ্ধ প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ কমিটিতে বিরোধী দলকে অন্তর্ভুক্ত করার বিষয়। এসব ক্ষেত্রে বিএনপি ভিন্ন অবস্থান নিয়ে স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় যোগ্য ব্যক্তিদের নিয়োগের পক্ষে মত দিয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে দুই-তৃতীয়াংশের বেশি আসন পেয়ে দলটি ক্ষমতায় এসেছে। ফলে যেসব বিষয়ে তারা ভিন্নমত দিয়েছে, সেগুলো বাস্তবায়নে তাদের নৈতিক বাধ্যবাধকতা কতটা—সে প্রশ্নও উঠেছে। বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান সাম্প্রতিক সংবাদ সম্মেলনে ইঙ্গিত দিয়েছেন, দল ঘোষিত ৩১ দফা ও নির্বাচনী ইশতেহারই হবে সংস্কারের মূল ভিত্তি। তিনি বলেন, জনগণের সঙ্গে মতবিনিময়ের মাধ্যমে প্রণীত ৩১ দফার আলোকে ইশতেহার তৈরি হয়েছে এবং প্রতিশ্রুত অঙ্গীকারগুলো পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন করা হবে।
আইনি ও সাংবিধানিক জটিলতার প্রসঙ্গ তুলে সংবিধান বিশেষজ্ঞরা বলছেন, পরবর্তী সংসদের ওপর জুলাই সনদ বাস্তবায়নের কোনো বাধ্যতামূলক আইনগত চাপ নেই। সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ও সংবিধান বিশেষজ্ঞ মনজিল মোরসেদ বলেন, সংসদের সার্বভৌম ক্ষমতার ওপর কোনো বাহ্যিক বাধ্যবাধকতা আরোপের সুযোগ নেই। ভবিষ্যৎ সংসদ কী করবে, তা আগেভাগে নির্ধারণ করে দেওয়ার আইনগত ভিত্তি নেই বলেও তিনি মত দেন। তবে রাজনৈতিক ঐকমত্যের কারণে নৈতিক দায় থাকতে পারে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
গণপরিষদ গঠনের প্রসঙ্গেও তিনি সংশয় প্রকাশ করেন। ইতোমধ্যে সরকার গঠনের প্রক্রিয়া শুরু হলেও গণপরিষদ নিয়ে সুস্পষ্ট আলোচনা নেই বলে তার মন্তব্য।
অন্যদিকে সংবিধান বিশেষজ্ঞ ড. শাহদীন মালিক বলেন, আন্তর্জাতিক চর্চায় আগে সংসদে প্রস্তাব পাস হয়, পরে গণভোট হয়। কিন্তু এখানে আগে গণভোট, পরে সংসদ—এটি প্রচলিত আইনগত ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংসদ ব্যবস্থা না নিলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিল গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য করার বিধানও আইনসম্মত কিনা, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
গণভোটে জুলাই সনদের পক্ষে ৬৮ দশমিক ০৬ শতাংশ ভোট পড়েছে। তবে সংসদ যদি এ সনদের কোনো অংশে পরিবর্তন আনে, তাহলে তা আবার গণভোটে নিতে হবে কিনা—সে প্রশ্নও আলোচনায় রয়েছে।
সংবিধান সংশোধনের প্রচলিত প্রক্রিয়া অনুযায়ী, একটি বিল জাতীয় সংসদে উত্থাপন করে দুই-তৃতীয়াংশ সদস্যের ভোটে পাস করতে হয়। এরপর রাষ্ট্রপতির অনুমোদনের মাধ্যমে তা আইনে পরিণত হয়। কিন্তু জুলাই জাতীয় সনদ বাস্তবায়ন আদেশের ধারা ৮-এ বলা হয়েছে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোট সংখ্যাগরিষ্ঠ হলে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সমন্বয়ে একটি সংবিধান সংস্কার পরিষদ গঠিত হবে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে সংস্কার সম্পন্ন করবে। এমনকি নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে কাজ শেষ না হলেও বিল গৃহীত হয়েছে বলে গণ্য করার বিধান রাখা হয়েছে।
ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৭২ সালের সংবিধানে গণভোটের বিধান ছিল না। পরবর্তীতে সংবিধানের পঞ্চম সংশোধনীর মাধ্যমে নির্দিষ্ট অনুচ্ছেদ সংশোধনে গণভোটের বিধান যুক্ত হয়। তবে ২০১১ সালে পঞ্চদশ সংশোধনীর মাধ্যমে সেই বিধান বাতিল করা হয়। বর্তমানে পঞ্চদশ সংশোধনী বাতিলের রায় আপিল বিভাগে বিচারাধীন। ভবিষ্যতে যদি গণভোটের বিধান পুনর্বহাল হয়, তাহলে জুলাই সনদের কিছু ধারায় পুনরায় গণভোটের প্রয়োজন হতে পারে বলেও মত দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।
সব মিলিয়ে গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলেও জুলাই সনদের বাস্তবায়ন এখন নির্ভর করছে সংসদের রাজনৈতিক সদিচ্ছা, সাংবিধানিক ব্যাখ্যা এবং সম্ভাব্য আইনি চ্যালেঞ্জের ওপর।

আপনার মতামত লিখুন :