প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান নেতৃত্বাধীন সরকারের ১০০ দিন পূর্ণ হয়েছে নানা প্রতিশ্রুতি, রাজনৈতিক চাপ ও বহুমাত্রিক সংকটের মধ্য দিয়ে। এই সময়ে সরকার কিছু জনকল্যাণমূলক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করলেও জ্বালানি সংকট, মূল্যস্ফীতি, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি, ব্যাংকিং খাতের অস্থিরতা এবং হামে শিশুমৃত্যুর মতো ইস্যুতে ব্যাপক সমালোচনার মুখে পড়েছে।
সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে, নির্বাচনি ইশতেহারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ বাস্তবায়নে তারা দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, ইমাম-মুয়াজ্জিন ও পুরোহিতদের ভাতা, প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের স্কুল ড্রেস বিতরণ, স্নাতক পর্যায়ে মেয়েদের বিনা বেতনে পড়ার সুযোগ এবং খাল খনন কর্মসূচি।
তবে এই ১০০ দিনে সরকারকে সবচেয়ে বেশি চাপে ফেলেছে জ্বালানি ও বিদ্যুৎ সংকট। যুক্তরাষ্ট্র-ইরান যুদ্ধকে কেন্দ্র করে বৈশ্বিক বাজারে জ্বালানির অস্থিরতার প্রভাব বাংলাদেশেও পড়ে। সরকার প্রথমে দাম না বাড়ানোর ঘোষণা দিলেও পরে জ্বালানির মূল্য বৃদ্ধি করতে বাধ্য হয়। এর প্রভাবে পরিবহন, শিল্প ও নিত্যপণ্যের বাজারেও চাপ বাড়ে। একই সময়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর প্রস্তাব ব্যবসায়ী ও শিল্পমহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
স্বাস্থ্য খাতেও বড় সংকট তৈরি হয়েছে। গত ৭০ দিনে হামে আক্রান্ত হয়ে ৫২৮ শিশুর মৃত্যুর তথ্য প্রকাশের পর স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সরকার টিকা সংগ্রহ ও বিশেষ ক্যাম্পেইনের ঘোষণা দিলেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পারেনি বলে সমালোচনা রয়েছে।
অর্থনীতির আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠেছে ঋণের চাপ। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বাংলাদেশের ঋণঝুঁকি ‘কম’ থেকে ‘মাঝারি’ পর্যায়ে উন্নীত করেছে। একইসঙ্গে ব্যাংকিং খাতে শৃঙ্খলা ফেরানো নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। খেলাপিঋণ, পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনা এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নেতৃত্ব নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের ওপর চাপ বেড়েছে। ধর্ষণ, খুন, মব হামলা ও রাজনৈতিক সহিংসতার ঘটনায় উদ্বেগ বাড়ছে। মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্যমতে, সরকারের প্রথম তিন মাসে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন শতাধিক নারী ও শিশু। এ নিয়ে সরকার ও বিরোধী দলের বক্তব্যে তীব্র ভিন্নতা দেখা গেছে।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতেও অস্থিরতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়েছে। ছাত্রদল ও ছাত্রশিবিরের সংঘর্ষ, বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে সহিংসতা এবং উপাচার্য নিয়োগকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সরকারকে বিব্রত করেছে।
রাজনৈতিকভাবে সরকারকে একদিকে মোকাবিলা করতে হচ্ছে প্রধান বিরোধী দল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামি-কে, অন্যদিকে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ ঘিরে নতুন রাজনৈতিক তৎপরতাও আলোচনায় রয়েছে। সরকারপক্ষ বলছে, একটি মহল উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাধাগ্রস্ত করতে অপপ্রচার ও অস্থিরতা তৈরির চেষ্টা করছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মূল্যায়নে দেখা যাচ্ছে, সরকার কিছু সামাজিক কর্মসূচিতে ইতিবাচক উদ্যোগ নিলেও জ্বালানি, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য ও আইনশৃঙ্খলার মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এখনো কার্যকর স্থিতিশীলতা আনতে পারেনি। তবে অনেকেই মনে করছেন, মাত্র ১০০ দিনে সব সংকট সমাধান সম্ভব নয়; বরং আগামী সময়ে সরকার এসব চ্যালেঞ্জ কীভাবে মোকাবিলা করে, সেটিই হবে মূল পরীক্ষা।

আপনার মতামত লিখুন :