ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘনিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়েছে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট-পরবর্তী রাজনীতিতে ‘নতুন বন্দোবস্ত’-এর কথা শোনা গেলেও মাঠের প্রচারে দৃশ্যত খুব বেশি পরিবর্তন দেখা যায়নি। বরং আগের মতোই পারস্পরিক আক্রমণ, ধর্মীয় ইঙ্গিতপূর্ণ বক্তব্য এবং ইতিহাস নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি ছিল প্রচারের বড় অংশজুড়ে।
শীর্ষ নেতৃত্বের পাল্টাপাল্টি বক্তব্য
প্রচারণার শুরু থেকেই বড় দলগুলোর শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে ছিল তীব্র সমালোচনা। ২২ জানুয়ারি সিলেটে এক সমাবেশে বিএনপির শীর্ষ নেতা তারেক রহমান নাম উল্লেখ না করে একটি দলকে লক্ষ্য করে মিথ্যাচার ও মানুষকে বিভ্রান্ত করার অভিযোগ তোলেন। মুক্তিযুদ্ধকালীন ভূমিকার প্রসঙ্গও তিনি তুলে ধরেন।
এর জবাবে ২ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রামে এক জনসভায় জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণার ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট নিয়ে বক্তব্য দেন। একই সমাবেশে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বী দলকে লক্ষ্য করে কড়া ভাষায় সমালোচনা করেন।
দুই দলের শীর্ষ পর্যায় থেকে এমন আক্রমণাত্মক ভাষা নির্বাচনী পরিবেশকে উত্তপ্ত করেছে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকেরা।
বিশ্লেষকদের পর্যবেক্ষণ
সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)-এর কেন্দ্রীয় সমন্বয়ক দিলীপ কুমার সরকার বলেন, প্রচারণায় কাঙ্ক্ষিত ইতিবাচক পরিবর্তন দেখা যায়নি। তার মতে, নতুন রাজনীতির কথা বলা দলগুলোর কাছ থেকেও প্রত্যাশিত সংযম মেলেনি। অনেক ক্ষেত্রেই উসকানিমূলক বক্তব্য পরিস্থিতিকে অস্বস্তিকর করেছে।
‘জবান’-এর সম্পাদক রেজাউল করিম রনি মনে করেন, রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একে অপরকে নেতিবাচকভাবে উপস্থাপনের প্রবণতা দীর্ঘদিনের। মুক্তিযুদ্ধের বয়ানকে অতিসংবেদনশীল বা বিকৃত—উভয় প্রবণতাই ক্ষতিকর বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অন্যদিকে রাজনৈতিক বিশ্লেষক ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবির বলেন, শুধু একটি দলকে দায়ী করলে হবে না; বড় দলগুলোর প্রচারণা কৌশলেও সংযমের অভাব রয়েছে। তার মতে, ভোটাররা এখন অতীতের বিতর্ক নয়, ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা শুনতে আগ্রহী।
নতুন প্রজন্মের রাজনীতি
নতুন ধারার রাজনীতির কথা বলা দলগুলোর প্রচারণা নিয়েও আলোচনা রয়েছে। কেউ কেউ মনে করছেন, তরুণ নেতৃত্বের মধ্যে রাজনৈতিক পরিপক্বতার ঘাটতি দেখা যাচ্ছে। তবে ব্যারিস্টার শাহরিয়ার কবিরের মতে, সাম্প্রতিক আন্দোলনে ভূমিকা রাখা তরুণদের সময় ও রাজনৈতিক প্রশিক্ষণের সুযোগ দেওয়া উচিত।
তিনি বড় দলগুলোর প্রতি আহ্বান জানিয়ে বলেন, প্রতিদ্বন্দ্বিতা যেন শত্রুতায় রূপ না নেয়। বরং গণতান্ত্রিক চর্চার পরিসর বিস্তৃত হওয়াই কাম্য।
ধর্মের ব্যবহার ও সহিংসতার প্রশ্ন
বিশ্লেষকদের মতে, ডান, বাম বা মধ্যপন্থি—সব ধারার দলেই প্রচারণায় ধর্মীয় উপাদানের ব্যবহার লক্ষ করা গেছে। পোশাক-আশাক ও বক্তব্যের ধরনেও এক ধরনের সাদৃশ্য তৈরি হয়েছে।
তবে সহিংসতার মাত্রা নিয়ে কিছুটা স্বস্তির কথা জানিয়েছেন দিলীপ কুমার সরকার। তার ভাষ্য, আশঙ্কার তুলনায় বড় ধরনের সহিংসতা কম ঘটেছে।
প্রত্যাশা সংযমের
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় বিতর্ক, সমালোচনা ও মতবিরোধ স্বাভাবিক। কিন্তু তা যেন বিদ্বেষ, ব্যক্তিগত আক্রমণ বা ইতিহাস বিকৃতির পর্যায়ে না পৌঁছায়—এমন প্রত্যাশাই রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও সচেতন নাগরিকদের। ভোটের শেষ প্রহরে এখন নজর সবার—নির্বাচনী আচরণ কতটা পরিণত ও দায়িত্বশীল হয়, সেদিকেই।

আপনার মতামত লিখুন :