কক্সবাজারের টেকনাফে মিয়ানমার সীমান্তবর্তী এলাকায় আবারও স্থলমাইনের অস্তিত্ব মিলেছে। হোয়াইক্যং ইউনিয়নের উলুবনিয়া সীমান্ত এলাকায় অভিযান চালিয়ে আরও ৫০টি স্থলমাইনের চাপ প্লেট বা ট্রিগার অংশ উদ্ধার করেছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। এর আগে একই এলাকায় ১০টি চাপ প্লেট উদ্ধার করা হয়েছিল।
গত ২০ জানুয়ারি সকাল সাড়ে ১০টার দিকে এসব মাইন ট্রিগার উদ্ধার করা হয়। যদিও প্রাথমিকভাবে এগুলোতে কোনো বিস্ফোরক পাওয়া যায়নি, তবে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে বলে জানিয়েছেন ৬৪ বিজিবির অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জহিরুল ইসলাম।
এই ঘটনার পর থেকে টেকনাফের হোয়াইক্যংসহ সীমান্তবর্তী এলাকায় সাধারণ মানুষের মধ্যে নতুন করে ভীতি ও আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। কৃষকরা মাঠে যেতে সাহস পাচ্ছেন না, জেলেরা মাছের ঘেরে কিংবা নাফ নদীতে নামছেন না। গবাদিপশুর পরিচর্যা কিংবা দৈনন্দিন জীবিকার কাজেও মানুষ অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।
বিজিবি অধিনায়ক জানান, সীমান্তের ওপারে চলমান সংঘাতের কারণে পুরো এলাকা এখনও ঝুঁকিপূর্ণ। স্থানীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিজিবির টহল ও নজরদারি আরও জোরদার করা হচ্ছে।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, মিয়ানমারের বিদ্রোহী গোষ্ঠী আরাকান আর্মির পুঁতে রাখা স্থলমাইনে প্রতিদিন কেউ না কেউ হতাহত হচ্ছেন। কারও হাত-পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছে, কেউ ঘটনাস্থলেই প্রাণ হারাচ্ছেন।
সর্বশেষ নাফ নদী এলাকায় মাইন বিস্ফোরণে মো. হানিফ (২৮) নামে এক যুবকের বাম পা বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। শুধু টেকনাফ নয়, বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার ঘুমধুম, দোছড়ি ও রুমা এলাকায় এ পর্যন্ত অন্তত ৫০ জন মানুষ মাইন বিস্ফোরণে একটি করে পা হারিয়েছেন।
নাইক্ষ্যংছড়ির চাকঢালা সীমান্ত এলাকার ৩৭ বছর বয়সী কৃষক আবদুস সালাম ২০২৫ সালের ২৯ মার্চ মাইন বিস্ফোরণে বাঁ পা হারান। এরপর থেকে তাঁর জীবিকা সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেছে। একই ধরনের অভিজ্ঞতার কথা জানান টেকনাফের হোয়াইক্যং সীমান্তে আহত জেলে মোহাম্মদ ফিরোজসহ আরও অনেক ভুক্তভোগী।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ সীমান্তে আরাকান আর্মির আগ্রাসী তৎপরতা দিন দিন উদ্বেগজনক রূপ নিচ্ছে। স্থলমাইন স্থাপন, ড্রোন ব্যবহার, ক্ষুদ্রাস্ত্র হামলা ও সীমান্ত অতিক্রম করে গুলিবর্ষণের ঘটনা এখন নিয়মিত হয়ে উঠেছে। এতে সীমান্তবর্তী জেলে, কৃষক ও শিশুদের জীবন মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ছে। পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালানকে ঘিরে একটি শক্তিশালী অবৈধ অর্থনীতিও গড়ে উঠছে, যা দেশের অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এর মধ্যে গোপনে পুঁতে রাখা স্থলমাইন পরিস্থিতিকে পরিণত করেছে এক ভয়াবহ মানবিক সংকটে।
নাইক্ষ্যংছড়ির ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ফরিদুল আলম জানান, আগে সীমান্তে মাইন পুঁতে রাখার কাজ মূলত মিয়ানমারের রাষ্ট্রীয় বাহিনীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল। তবে সাম্প্রতিক বিস্ফোরণগুলোর বেশির ভাগই আরাকান আর্মির স্থাপন করা মাইনের কারণে হচ্ছে বলে তারা ধারণা করছেন। তাঁর মতে, সাধারণ রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর চলাচল সীমিত করা এবং তাদের শারীরিকভাবে অক্ষম করে তুলতেই এসব মাইন ব্যবহার করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে বিজিবির রামু সেক্টরের অধিনায়ক কর্নেল মোহাম্মদ মহিউদ্দিন আহমেদ বলেন, সীমান্ত এলাকার বাসিন্দাদের নিয়মিত সতর্ক করা হচ্ছে। তবে বাস্তবতা হলো, মিয়ানমার জাতিসংঘের মাইন নিষিদ্ধকরণ চুক্তিতে স্বাক্ষর করেনি। ফলে আন্তর্জাতিকভাবে তাদের ওপর কার্যকর জবাবদিহির চাপও নেই।
তিনি আরও জানান, আগে সীমান্তে কোনো বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটলে প্রতিবাদ জানিয়ে মিয়ানমারের বিজিপির সঙ্গে আলোচনা করা যেত। কিন্তু বর্তমান সীমান্ত পরিস্থিতির কারণে সেই সুযোগ অনেকটাই সীমিত। এ অবস্থায় সর্বোচ্চ সতর্কতাই একমাত্র করণীয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
উল্লেখ্য, ইন্টারন্যাশনাল ক্যাম্পেইন টু ব্যান ল্যান্ডমাইনস (আইসিবিএল)-এর ‘ল্যান্ডমাইন মনিটর ২০২৪’ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বে ভূমিমাইনে হতাহতের শীর্ষ দেশগুলোর মধ্যে মিয়ানমার অন্যতম।

আপনার মতামত লিখুন :