বিশ্ব পরিবেশ দিবসে চট্টগ্রামের আনোয়ারা উপজেলার গহিরা প্যারাবনের বাস্তব চিত্র আবারও সামনে এসেছে। একসময় উপকূলীয় অঞ্চলের প্রাকৃতিক ঢাল হিসেবে পরিচিত এই সংরক্ষিত বনভূমি এখন দখল, গাছ নিধন এবং অবৈধভাবে মাটি কাটার কারণে অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে প্রভাবশালী একটি চক্র বনাঞ্চল ও এর আশপাশের এলাকা থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন প্রকল্পে ব্যবহার ও বিক্রি করছে, অথচ কার্যকর কোনো পদক্ষেপ দেখা যাচ্ছে না।
শঙ্খ নদী ও বঙ্গোপসাগরের মোহনায় অবস্থিত গহিরা প্যারাবন উপকূলকে ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আঘাত থেকে সুরক্ষা দিয়ে আসছে। তবে বনভূমির বিভিন্ন অংশে মাটি কেটে নেওয়ায় প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি জীববৈচিত্র্যও মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়েছে। স্থানীয়দের দাবি, অতীতে বনভূমির একটি বড় অংশ উজাড় করে সেখানে মাছের ঘের তৈরি করা হয়েছে এবং এখন সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এলাকায় চলমান একটি বেড়িবাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহারের জন্য বনাঞ্চলসংলগ্ন স্থান থেকে মাটি সংগ্রহের অভিযোগ উঠেছে। সরেজমিনে দেখা যায়, প্যারাবনের পাশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বড় বড় গর্ত সৃষ্টি হয়েছে, যা দেখে সহজেই বোঝা যায় সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ মাটি অপসারণ করা হয়েছে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে চলতে থাকলে বর্ষা ও জলোচ্ছ্বাসের সময় বনাঞ্চল আরও ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
এ বিষয়ে পানি উন্নয়ন বোর্ডের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, প্রকল্পের জন্য কাছাকাছি এলাকা থেকে মাটি না নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়। তবে ঠিক কোথা থেকে মাটি সংগ্রহ করা হচ্ছে, সে বিষয়ে সবসময় তাদের নজরদারি থাকে না। অন্যদিকে, অভিযোগের বিষয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়িত্বশীল কারও বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
পরিবেশবিদরা বলছেন, ম্যানগ্রোভ বা প্যারাবন শুধু গাছের সমষ্টি নয়, এটি উপকূলীয় পরিবেশের জন্য একটি প্রাকৃতিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা। এসব বন সমুদ্রের ঢেউয়ের গতি কমিয়ে জনপদকে রক্ষা করে এবং অসংখ্য জলজ ও স্থলজ প্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে কাজ করে। ফলে বন কেটে মাছের ঘের তৈরি বা মাটি অপসারণের মতো কর্মকাণ্ড দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশের জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অনুমতি ছাড়া বনভূমি দখল ও মাটি কাটা দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী শাস্তিযোগ্য অপরাধ। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে অভিযোগ ওঠার পরও কার্যকর ব্যবস্থা না নেওয়ায় দখলদাররা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে। স্থানীয়রা দ্রুত অবৈধ মাটি কাটা বন্ধ, বনভূমি পুনরুদ্ধার এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
উপকূলীয় বন বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯১ সালের প্রলয়ঙ্করী জলোচ্ছ্বাসের পর উপকূল রক্ষার উদ্দেশ্যে প্রায় ২৫০ একর এলাকাজুড়ে গড়ে তোলা হয় গহিরা প্যারাবন। কেওড়া, গেওয়া, বাইনসহ বিভিন্ন প্রজাতির হাজার হাজার গাছ নিয়ে গড়ে ওঠা এই বন আজ উপকূলীয় সুরক্ষার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। পরিবেশবিদদের মতে, গহিরা প্যারাবন রক্ষায় এখনই কার্যকর উদ্যোগ না নিলে ভবিষ্যতে আনোয়ারা উপকূল আরও বড় পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে পড়বে।

আপনার মতামত লিখুন :