ঢাকা শনিবার, ০৬ জুন ২০২৬
বাড়ছে স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক ঝুঁকি

সুপার এল নিনোর প্রভাবে দীর্ঘ হচ্ছে তাপপ্রবাহ

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ০৫ জুন, ২০২৬, ০২:১৩ দুপুর

ছবি: সংগৃহীত

দেশজুড়ে চলমান তীব্র তাপপ্রবাহ ক্রমেই উদ্বেগজনক পরিস্থিতির সৃষ্টি করছে। দেশের বহু জেলায় মৃদু থেকে তীব্র তাপদাহ অব্যাহত থাকায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের পাশাপাশি ‘সুপার এল নিনো’র প্রভাব তাপপ্রবাহের স্থায়িত্ব ও তীব্রতা বাড়িয়ে দিচ্ছে, যা ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের সংকট ডেকে আনতে পারে।

আবহাওয়া অধিদফতরের তথ্য অনুযায়ী, দেশের প্রায় অর্ধশতাধিক জেলায় তাপপ্রবাহ বয়ে যাচ্ছে। কোথাও কোথাও তাপমাত্রা ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের কাছাকাছি পৌঁছেছে। রাজধানীসহ বিভিন্ন এলাকায় বৃষ্টির সম্ভাবনা থাকলেও তাতে গরম পুরোপুরি কমার সম্ভাবনা নেই। বরং বাতাসে আর্দ্রতার পরিমাণ বেশি থাকায় অস্বস্তিকর আবহাওয়া বিরাজ করতে পারে।

জলবায়ু গবেষকদের ভাষ্য, এল নিনো হলো প্রশান্ত মহাসাগরের নিরক্ষীয় অঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক প্রক্রিয়া। যখন এই উষ্ণতা স্বাভাবিকের তুলনায় প্রায় দুই ডিগ্রি সেলসিয়াস বা তার বেশি বৃদ্ধি পায়, তখন তাকে ‘সুপার এল নিনো’ বলা হয়। এর প্রভাবে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা ও অস্বাভাবিক আবহাওয়ার ঘটনা বেড়ে যায়।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আগে বাংলাদেশে বছরে এক বা দুইবার স্বল্প সময়ের জন্য তাপপ্রবাহ দেখা গেলেও এখন বছরে একাধিকবার দীর্ঘস্থায়ী তাপদাহ দেখা দিচ্ছে। একই সঙ্গে আগের তুলনায় তাপমাত্রাও বেশি রেকর্ড হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে প্রকৃত তাপমাত্রার চেয়ে অনুভূত তাপমাত্রা কয়েক ডিগ্রি বেশি হওয়ায় মানুষের কষ্ট আরও বাড়ছে।

তীব্র গরমে সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগে পড়ছেন খোলা আকাশের নিচে কাজ করা শ্রমজীবী মানুষ। রিকশাচালক, নির্মাণশ্রমিক ও কৃষিশ্রমিকরা দীর্ঘ সময় কাজ করতে পারছেন না। ফলে তাদের আয় কমে যাচ্ছে। পাশাপাশি শিশু, বয়স্ক ব্যক্তি ও অসুস্থ রোগীদের মধ্যে গরমজনিত নানা স্বাস্থ্যসমস্যা বাড়ছে।

চিকিৎসকরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, দীর্ঘ সময় অতিরিক্ত তাপমাত্রায় অবস্থান করলে হিটস্ট্রোক, পানিশূন্যতা, কিডনি জটিলতা, হৃদরোগ এবং শ্বাসকষ্টের ঝুঁকি বৃদ্ধি পায়। বিশেষ করে শিশু, প্রবীণ ও অন্তঃসত্ত্বা নারীরা বেশি ঝুঁকিতে থাকেন। আবার গরমের মধ্যে বিচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত ডেঙ্গুসহ বিভিন্ন রোগের প্রকোপও বাড়িয়ে দিতে পারে।

তাপপ্রবাহের প্রভাব কৃষিখাতেও স্পষ্ট হয়ে উঠছে। অতিরিক্ত গরমে মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমে যাওয়ায় সেচের প্রয়োজন বাড়ছে এবং উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে। অনেক কৃষক সময়মতো চাষাবাদ করতে না পারায় ফসল উৎপাদন নিয়ে উদ্বেগে রয়েছেন। একই সঙ্গে গবাদিপশু ও পোলট্রি খামারেও তাপমাত্রার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে।

বিদ্যুতের চাহিদাও এই সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র ও বৈদ্যুতিক পাখার ব্যবহার বাড়ায় জাতীয় গ্রিডের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়। ফলে অনেক এলাকায় লোডশেডিং দেখা দেয়, যা শিল্প উৎপাদন ও সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে ব্যাহত করছে।

পরিবেশবিদদের মতে, তাপপ্রবাহ এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো আবহাওয়াগত ঘটনা নয়; এটি জলবায়ু পরিবর্তনের বাস্তব ও দৃশ্যমান প্রভাব। অপরিকল্পিত নগরায়ন, জলাশয় ভরাট, বৃক্ষনিধন এবং জীবাশ্ম জ্বালানির অতিরিক্ত ব্যবহার পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।

তাদের মতে, ভবিষ্যতের ঝুঁকি কমাতে এখনই পরিবেশবান্ধব নগর পরিকল্পনা, সবুজায়ন বৃদ্ধি, জলাশয় সংরক্ষণ এবং কার্বন নিঃসরণ কমানোর কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ জরুরি। অন্যথায় তাপপ্রবাহের প্রকোপ আরও বৃদ্ধি পেয়ে জনস্বাস্থ্য, অর্থনীতি ও পরিবেশের ওপর দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

Link copied!