মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতা ও আঞ্চলিক প্রভাব বিস্তারের প্রেক্ষাপটে মুসলিম বিশ্বের কয়েকটি প্রভাবশালী দেশ নতুন নিরাপত্তা জোট গঠনের বিষয়ে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। কূটনৈতিক ও সামরিক পর্যায়ের সাম্প্রতিক তৎপরতা বিশ্লেষণ করে পর্যবেক্ষকরা বলছেন, পাকিস্তান, তুরস্ক, সৌদি আরব ও মিসরকে ঘিরে ভবিষ্যতে একটি শক্তিশালী আঞ্চলিক নিরাপত্তা বলয় গড়ে উঠতে পারে, যাকে অনেকে ‘ইসলামি ন্যাটো’ হিসেবেও আখ্যা দিচ্ছেন।
সম্প্রতি পাকিস্তানে মিসর ও পাকিস্তানের বিশেষ বাহিনীর অংশগ্রহণে দুই সপ্তাহব্যাপী যৌথ সামরিক মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামরিক সহযোগিতার এমন উদ্যোগ নতুন না হলেও, বর্তমান ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় এর গুরুত্ব বেড়েছে কয়েক গুণ। বিশ্লেষকদের মতে, গাজা যুদ্ধ, সিরিয়া ও লেবাননে ইসরায়েলি হামলা এবং ইরানকে ঘিরে উত্তেজনা—সব মিলিয়ে মুসলিম দেশগুলো নিজেদের নিরাপত্তা কৌশল নতুনভাবে ভাবতে শুরু করেছে।
গত বছরের সেপ্টেম্বরে কাতারের দোহায় হামলার পর থেকেই চার দেশের মধ্যে উচ্চপর্যায়ের যোগাযোগ ও সমন্বয় বাড়তে থাকে। মিসরীয় বিশ্লেষক ইসলাম মানসির মতে, ওই ঘটনার পর আরব দেশগুলো বুঝতে পারে যে, আঞ্চলিক সংঘাতের আগুন যে কোনো সময় তাদের দোরগোড়ায় পৌঁছে যেতে পারে।
এদিকে পাকিস্তানের প্রতিরক্ষামন্ত্রী খাজা আসিফ সম্প্রতি এক টেলিভিশন সাক্ষাৎকারে জানান, সৌদি আরবের সঙ্গে বিদ্যমান প্রতিরক্ষা সহযোগিতার কাঠামোয় কাতার ও তুরস্ককে যুক্ত করার বিষয়ে আলোচনা চলছে। তার ভাষায়, এ ধরনের সম্প্রসারণ হলে তা হবে অঞ্চলের জন্য ইতিবাচক অগ্রগতি।
আঙ্কারাভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্লেষকেরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো এখন কেবল যুক্তরাষ্ট্রের নিরাপত্তা ছাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে চাইছে না। তাদের ধারণা, ওয়াশিংটন বরাবরই নিজেদের ও ইসরায়েলের কৌশলগত স্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়। ফলে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর মধ্যে সমন্বিত প্রতিরক্ষা কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা বাড়ছে।
সম্ভাব্য এই জোট গড়ে উঠলে তার সম্মিলিত জনসংখ্যা প্রায় ৫০ কোটিতে পৌঁছাবে এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার দিক থেকেও এটি একটি বড় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হতে পারে। সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, চার দেশের পৃথক সামরিক সক্ষমতা একত্রিত হলে মধ্যপ্রাচ্যে নতুন ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি হতে পারে।
গত এপ্রিলে তুরস্কে অনুষ্ঠিত আন্তালিয়া ডিপ্লোম্যাসি ফোরামের ফাঁকে চার দেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রীদের বৈঠককে অনেকেই এই জোট গঠনের সম্ভাব্য ভিত্তি হিসেবে দেখছেন। ওই বৈঠকে আঞ্চলিক নিরাপত্তা, প্রতিরক্ষা সহযোগিতা ও কৌশলগত সমন্বয় নিয়ে আলোচনা হয়েছে বলে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে এই উদ্যোগের পথে বেশ কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে। সৌদি আরব, তুরস্ক ও মিসরের মধ্যে দীর্ঘদিনের কূটনৈতিক টানাপোড়েন মাত্র সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিছুটা কমেছে। পাশাপাশি সৌদি আরব ও মিসরের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘস্থায়ী সামরিক ও কৌশলগত সম্পর্ক রয়েছে। ফলে ইসরায়েলবিরোধী কোনো আনুষ্ঠানিক জোট গঠনের ক্ষেত্রে ওয়াশিংটনের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
তুর্কি বিশ্লেষক ফিরাস রিদওয়ান ওগলুর মতে, এ ধরনের আঞ্চলিক জোট গড়ে উঠলে তা নতুন সংঘাত উসকে দেওয়ার বদলে বরং মধ্যপ্রাচ্যে শক্তির ভারসাম্য তৈরি করতে পারে। এতে বড় ধরনের যুদ্ধের ঝুঁকি কমবে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা বাড়বে।

আপনার মতামত লিখুন :