ঢাকা শুক্রবার, ১৫ মে ২০২৬

মানবদেহ থেকে সমুদ্রের তিমি—সবখানেই ছড়িয়ে পড়ছে প্লাস্টিকের ভয়াবহতা

নিউজ ডেস্ক

প্রকাশিত: ১৫ মে, ২০২৬, ০৯:৪৭ সকাল

ছবি: সংগৃহীত

সকাল সাড়ে সাতটা। রাজধানীর উত্তরা ১০ নম্বর সেক্টরের একটি স্কুলের সামনে অভিভাবকদের ব্যস্ততা। শিশুদের হাতে টিফিন বক্স, পিঠে ব্যাগ, আর অধিকাংশের সঙ্গেই রয়েছে রঙিন প্লাস্টিকের পানির বোতল। ছয় বছর বয়সী আয়ানও তাদেরই একজন। স্কুলে ঢোকার আগে মা নুসরাত জাহান ছেলের পানির বোতল ঠিক করে দেন। প্রতিদিনের মতোই বাসা থেকে নিরাপদ পানি ভরে দিয়েছেন তিনি।

নুসরাতের ভাষায়, “স্কুলে বাইরের পানি খেতে দেই না। বাসার পানি নিরাপদ।”

কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, সেই ‘নিরাপদ’ পানির বোতলই এখন উদ্বেগের বড় কারণ। বিশ্বজুড়ে সাম্প্রতিক গবেষণায় দেখা যাচ্ছে, প্লাস্টিক বোতল, পলিথিন, খাবারের প্যাকেট ও ডিসপোজেবল কাপ থেকে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা বা মাইক্রোপ্লাস্টিক মানুষের শরীরে প্রবেশ করছে।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) জানিয়েছে, মাইক্রোপ্লাস্টিক এখন পানীয় জল, খাদ্যশৃঙ্খল এমনকি বাতাসেও ছড়িয়ে পড়েছে। যদিও মানুষের শরীরে এর দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব নিয়ে এখনও গবেষণা চলমান, তবুও স্বাস্থ্যঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে বিশ্বজুড়ে।

বাংলাদেশে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। প্রায় দুই দশক আগে নিষিদ্ধ হওয়া পলিথিন এখনো বাজার, রাস্তা, স্কুল, হাসপাতাল—সবখানেই অবাধে ব্যবহৃত হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি আর শুধু পরিবেশ দূষণের বিষয় নয়; বরং জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।

২০০২ সালে বাংলাদেশ সরকার পলিথিন শপিং ব্যাগ নিষিদ্ধ করে আন্তর্জাতিকভাবে প্রশংসিত হয়েছিল। বাংলাদেশ ছিল বিশ্বের প্রথম দেশগুলোর একটি, যারা এমন উদ্যোগ নেয়। বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫-এর ৬ক ধারার আওতায় পলিথিনের উৎপাদন, বাজারজাতকরণ, বিক্রি, ব্যবহার ও পরিবহন নিষিদ্ধ করা হয়। আইনে সর্বোচ্চ ১০ বছর কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধানও রয়েছে।

তবে বাস্তবে বাজারের চিত্র ভিন্ন। রাজধানীর কারওয়ান বাজারে মাছ, সবজি, মরিচ—সবকিছুই এখনও আলাদা আলাদা পাতলা পলিথিনে ভরে দেওয়া হচ্ছে। দোকানদার সোহেল মিয়া বলেন, “মানুষ পলিথিন ছাড়া নিতে চায় না। কাপড়ের ব্যাগ আনে না কেউ। কাগজের ব্যাগ দিলে খরচ বেশি পড়ে।”

একই চিত্র দেখা যায় রাজধানীর কুড়িল, খিলক্ষেত, মোহাম্মদপুরসহ প্রায় সব বাজারে।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, শুধু ঢাকাতেই প্রতিদিন প্রায় ৬৪৬ টন প্লাস্টিক বর্জ্য তৈরি হয়। বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, দেশে প্রতিদিন ১ হাজার ৭০০ থেকে ৩ হাজার টন পর্যন্ত প্লাস্টিক বর্জ্য উৎপন্ন হচ্ছে, যার বড় অংশই সঠিকভাবে ব্যবস্থাপনা করা হয় না।

জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি বলছে, প্রতি বছর প্রায় ১৯ থেকে ২৩ মিলিয়ন টন প্লাস্টিক বর্জ্য নদী ও সমুদ্রে প্রবেশ করছে। এর ফলে জলজ পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

সমুদ্র গবেষণায় দেখা গেছে, ডলফিন, কচ্ছপ ও তিমিসহ শতাধিক সামুদ্রিক প্রাণীর পাকস্থলিতে প্লাস্টিক পাওয়া গেছে। কিছু মৃত তিমির পেটে ৩০ থেকে ৪০ কেজি পর্যন্ত প্লাস্টিকও উদ্ধার হয়েছে। গবেষকদের মতে, খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে এই প্লাস্টিক ছোট মাছ থেকে বড় সামুদ্রিক প্রাণী হয়ে শেষ পর্যন্ত মানুষের শরীরেও প্রবেশ করছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শিশু ও গর্ভবতী নারীরা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছেন। ২০২০ সালে নেচার ফুড জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা যায়, শিশুদের ব্যবহৃত প্লাস্টিক বোতল থেকে প্রতিদিন লাখ লাখ মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা বের হতে পারে। গরম পানি ব্যবহার করলে সেই ঝুঁকি আরও বাড়ে।

শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. শিমুল আহমেদ বলেন, “শিশুরা শরীরের ওজনের তুলনায় বেশি এক্সপোজারের মধ্যে থাকে। তারা প্রতিদিন প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছে। দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব নিয়ে বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ বাড়ছে।”

২০২৪ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ইউনিভার্সিটি অব নিউ মেক্সিকোর গবেষকরা ৬২টি মানব প্লাসেন্টা পরীক্ষা করে প্রতিটিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি পান। সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় পলিইথাইলিন, যা পলিথিন ব্যাগ ও খাবারের প্যাকেটে ব্যবহৃত হয়।

গবেষকদের আশঙ্কা, এসব কণা ভ্রূণের স্বাভাবিক বিকাশেও প্রভাব ফেলতে পারে।

ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুজ্জামান মজুমদার বলেন, “বিদেশে এখন মানুষের রক্ত, ফুসফুস এমনকি প্লাসেন্টাতেও মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যাচ্ছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ বিষয়ে গবেষণা খুবই সীমিত। আমরা আসলে জানিই না আমাদের শরীরে কত প্লাস্টিক প্রবেশ করছে।”

চিকিৎসক ডা. আয়শা কবির বলেন, “গর্ভবতী নারীরা প্রতিদিন কতভাবে প্লাস্টিকের সংস্পর্শে আসছেন, সেটার হিসাবই করা হচ্ছে না।”

বিশেষজ্ঞদের মতে, নিম্নমানের প্লাস্টিক তাপের সংস্পর্শে এলে সেখান থেকে রাসায়নিক পদার্থ খাবারে মিশে যেতে পারে, যা মানবদেহের হরমোন ব্যবস্থায় নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতোমধ্যে প্লাস্টিক নিয়ন্ত্রণে কঠোর ব্যবস্থা নিয়েছে। জার্মানিতে বোতল ফেরত দিলে টাকা ফেরত দেওয়া হয়, দক্ষিণ কোরিয়ায় বর্জ্য আলাদা না করলে জরিমানা করা হয়, আর রুয়ান্ডা প্রায় পুরোপুরি পলিথিনমুক্ত দেশ হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে।

বাংলাদেশ একসময় পলিথিন নিষিদ্ধ করে বিশ্বকে পথ দেখিয়েছিল। কিন্তু দুই দশক পর সেই নিষিদ্ধ পলিথিনই এখন বাজার, নদী, খাবার ও মানুষের শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে।

স্কুলগামী ছোট্ট আয়ান হয়তো এখনো জানে না, প্রতিদিন তার হাতে থাকা প্লাস্টিকের বোতল নিয়েই উদ্বিগ্ন বিশ্বজুড়ে বিজ্ঞানীরা। আর তার মা নুসরাতও জানেন না—অজান্তেই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তৈরি হচ্ছে এক নতুন স্বাস্থ্যঝুঁকি।

 
 
 

Link copied!